স্বপনের আজ অফিসে যেতে ইচ্ছে করছে না। গুম মেরে শুয়ে আছে নিজের ছোট ফ্লাটে।
সকাল নয়টায় শুধু একবার ঘুম ভেঙ্গেছে।
আর মনে মনে অফিসে নাযাওয়ার ইচ্ছাটা পাকা করে আবার ঘুমিয়ে পড়েছে।
রিংটোনের বিকট চিৎকারে ধড়ফড় করে উঠে বসে।
'স্লামালাইকুম মামা!'
'ওয়ালাইকুম, তোর খালু এই মাত্র ইন্তেকাল করেছে। তাড়াতাড়ি বারডেম চলে আয়।
লাশের সঙ্গে তোকে যশোর যেতে হবে।'
লাইন কেটে যায়। স্বপন চুপচাপ কতক্ষণ বসে থাকে। ভাবে, একেই বলে নিয়তি! অফিসে যেতে কষ্ট লাগছিলো, এখন যশোর যেতে হবে! লাফদিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। বিছানার প্রতি লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকায়, আবার কখন গা এলিয়ে এখানে শুতে পারবে কে জানে....!
পদ্মাঘাটে ওরা খাওয়া দাওয়া করে নেয় ফেরির হোটেলে।
স্বপন পেটপুরেই খায়। তবে চেহারার মাঝে একটা দুখিদুখি ভাব রেখে দ্রুত খেয়ে নেয়।
খালাত ভাইকে ভাত খেতে সাধাসাধি করতে ওর খিদে আরো বেড়ে যায়।
ন্যাকামি দেখলে গা জ্বলে যায়।
ভাবটা এমন যেন বাপ মারা গেছে আর কোনদিন ভাত খাবে না।
শোকে পাথর হয়ে থাকবে। শিক্ষিত মানুষের এই জাতীয় কুসংস্কার দেখলে স্বপনের পিত্তি গরম হয়ে যায়।
তবু সব রাগ সংবরণ করে দাদাভাই সোনাভাই সবাইকেই একদিন যেতে হবে।
আমরা থাকার জন্য নই।
কেউ চাইলেও থাকতে পারবে না ইত্যাদি মহাবাণী সমূহ শুনিয়ে তবেই ভাত খাওয়াতে রাজি করাতে হয়।
ব্যাপারটা খুব জটিল। বিশেষ, নিজের ভেতর যখন ফিলিং থাকেনা।
স্বপন এই লাশবাহী যাত্রাকে মনে মনে একটা ভ্রোমণ পার্টি হিসেবে ভেবে নিয়েছে।
লাশটাকেও একজন ভ্রোমণ সঙ্গী হিসেবে নেয়। ভ্রোমণস্পটে গিয়ে একদল ক্যামিস্ট্রিদের সহায়তায় তাকে হীমঘর থেকে জাগিয়ে তোলা হবে। সেও আমাদের সঙ্গে পিকনিকে শামিল হবে।
কবে যেন এমন একটা গল্প পড়েছিলো স্বপন। 'এক বড় নেতা দেশের চরম গণ্ডগোলের সময় জানের নিরাপত্তার স্বার্থে দেশ থেকে বেরিয়ে যাবে। কিন্তু জীবিতাবস্থায় শত্রুচোখ ফাকি দিয়ে বের হওয়া অসম্ভব।
তখন একদল শুভাকাঙ্ক্ষী বিজ্ঞানী নেতাকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় ছোট একটা আইসক্রিমের বাক্সে ঢুকিয়ে ফরফে পরিনত করে দেয়। এবং আইসক্রিম এর গাড়ী করে বর্ডার পাস করে।
স্বপন একবার ভাবে, লাশটাও জিন্দা হবে।
তবে ক্যামিস্ট্রিদের সহযোগীতায় নয়। হবে
ফেরেশতাদের সহয়তায়।
রাত আটটা নাগাত স্বপনরা যশোর খালুবাড়ী পৌঁছে যায়।
কাঁন্নার ঢল নামে। অবশ্য স্বপন মানুষিকভাবে প্রস্তুত ছিলো।
লাশ কবরস্ত করতে করতে রাত বারটা বেজে যায়।
এবার স্বপন লক্ষ্য করে বাড়ীময় নেমে এসেছে এক মরণ নীরবতা।
গা ছমছম করা নীরবতা।
স্বপনের একবার মনে হয় এই নীরবতার চেয়ে কাঁন্নাই ভাল ছিলো।
স্বপন ছিলো উঠানে চেয়ারে বসা।
খালাত ভাই আফজাল পিছন দিয়ে এসে হাত ধরে হাটা শুরু করে।
মুখে কোন কথা নাই।
এবাড়ীর কারোরই যেন আর কথা বলার কিছু নাই। কাঁন্নার কিছু নাই।
ঝড়ের শেষের অখণ্ড নীরবতা চলছে।
কেউ যেন তা আগে ভাঙ্গতে চায় না।
ওরা পাশের বাড়ীর উঠানে এসে দাড়ালো।
আফজাল হাত ছেড়ে দিয়ে বারান্দায় গিয়ে ডাক দিলো 'রিতু......'
পরমুহূর্তেই স্বপন দেখলো এক কিশোরী মেয়ে, 'জি ভাইজান'
'বারান্দার চকিটায় ভাল মত বিছানা কর।
আর একজগ পানি গ্লাস রাখিস মাথার কাছে।' স্বপন দেখলো মেয়েটা দ্রুত কয়েকবার মাথা লাড়ালো।
স্বপনকে উদ্দেশ্য করে আফজাল যেতে যেতে বললো, ' লাপনি এখানেই ঘুমান। কোনকিছুর প্রয়োজন হলে আওয়াজ দিবেন ওরা ব্যবস্থা করবে।'
'আচ্ছ!'
মেয়েটা ডাক দেয় 'আসুন।'
নিঃশব্দে স্বপন উঠে আসে বারান্দায়।
টয়লেট যেতে হলে , বলেই মেয়েটা হাত দিয়ে ইশারা করে। স্বপন দেখে নেয় টয়লেটের অবস্থান।
মুখে বলে,'ধন্যবাদ!'
পরের দিন সকাল দশটা। স্বপন ঢাকায় ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অদূরে একটা আমগাছের নিচে রিতু দাঁড়িয়ে আছে।
চোখের ভাষা কী যেন বলতে চায়।
কয়েকবার বেশ কয়েকবার চোখাচোখি হল। স্বপনের চোখেও কি যেন ভেসে ওঠে আবার নিভে যায়। স্বপন ভাবে গ্রামের নাইন টেন পড়ুয়া একটা মেয়ে হয়েও যথেষ্ট স্মার্ট।
বিশুদ্ধ উচ্চারণ। গায়ের রঙ বাদামি ফরসা।
ঘন কালো চুল।
রূপসী না হলেও চোখ কান নাক মোটকথা সমস্তটা মিলে এক মায়াময় রূপের আকর্ষণ কেমনে স্বপন উপেক্ষা করে।
চোখের মনিগুলো কী অপার্থিব সুগভীর রহস্যধারিণী মধুবর্ণ ।
এখনই স্বপনকে ফিরতে হবে। কী করবে স্বপন কিছুই বুঝে উঠতে পারেনা।
শোকের পরিবেশে এ তার কী হল।
অপরাধবোধে কুঁকড়ে যায় স্বপন।
না, এখনো তাকিয়ে আছে রিতু।
এ চোখ উপেক্ষার নয়। কিছু একটা করা দরকার। উঠোন ভরা মানুষ।
হঠাৎ করে একটা বুদ্ধি মাথায় আসে।
মানিব্যাগ থেকে একটা কার্ড বের করে একটু সামনে হেটে যায়। উঠানের পাশে একটা মালঞ্চগাছের মাচা, সেখানে একফাকে কার্ডটা ডুকিয়ে রেখেই স্বপন তাকায় মেয়েটার দিকে।
ওমা, স্বপন লক্ষ্য করে রিতুর চোখের সেই আকুতির যায়গা ঘিরে রাগ ফুটে উঠেছে।
স্বপন ভেবে পায়না হঠাৎ রেগে গেল কেন মেয়েটা......
কি মনে করে স্বপন পিছন ফিরে তাকায়। এবং দেখতে পায় আফজাল তাকিয়ে আছে ওর দিকে। চোখাচোখি হতেই আফজাল চোখ সরিয়ে নেয়।
স্বপন ধীর পায়ে পিছে ফেরে।
কার্ডটা ইতোমধ্যে হাতের মাঝে দলা পাকিয়ে নিয়েছে। মামা তাড়া দেয় গাড়ীতে ওঠ, তাড়াতাড়ি তাড়াতাড়ি....!
স্বপনের আর সহস হয়না তাকাতে।
তবু একবার তাকায়।
না নেই। আমগাছের নিচে আর কেউ নেই।
গাড়ী স্টার্ট নেয়। স্বপনের ইচ্ছে করে বলতে, ড্রাইভার দাঁড়াও, দু'মিনিট।
আমি আসছি। বলা হয়না।
মামা বলে স্বপন, গ্লাস লাগিয়ে দে,
এসি চলছে।
রাত এগারটা। স্বপন শুয়ে আছে তার ছোট ফ্লাটে। ঘুম আসছে না।
মাথার মধ্যে একটা পোকা ঢুকেছে।
কিছুতেই বের হচ্ছেনা।
ধুর...! তাড়াতাড়ি ঘুমানো দরকার।
কাল অফিসে যেতেই হবে......!
No comments:
Post a Comment