Sunday, January 24, 2016

কথা মেরি

'হ্যালো মেরি,'
'হাই রাজু কেমন আছেন অনেকদিন পর
ফোন করলেন যে?'
'আপনার ঠোটে কি এই মূহুর্তে
লিপিস্টিক আছে?'
'হ্যা আছে, হালকা গোলাপি কালারের।
কেন বলেন তো ....?'
'আপনি কি আজ সন্ধ্যায় সংসদের
সামনে আসতে পারবেন?'
'তা আসা যেতে পারে। কেন সেটা তো
আগে বলেন? '
'খুব লিপিস্টিক খেতে ইচ্ছে করছে।
অনেকদিন হল খাইনা।'
'মনে হচ্ছে আগে অনেকবার লিপিস্টিক
খেয়েছেন। যেভাবে বলছেন!'
'না খাইনি। তবে কল্পনায় বহুবার
স্বাদটা নিতে চেষ্টা করেছি।'
'তাহলে এবারও সেটাই করেন। আমার
আসতে বয়েই গেছে।'
'তাহলে লিপিস্টিক লাগান কেন?
'লাগাই আপনাকে লোভ দিতে।'
'লোভ দেখিয়ে আপনার লাভ?'
'আমার লাভ-ক্ষতির হিসেব দিয়ে
আপনার দরকার কি?'
'তাইতো! আমি তো শুধু লিপিস্টিক
খেতে চাই।
আপনি বোধয় রেগে যাচ্ছেন?'
'মোটেই না।'
'আচ্ছা, রাগলে আপনাকে কেমন লাগে?'
রু'মান্টিকতা ছাড়ুন ফোনটা রাখুন।
হুযূর মানুষের এতো রোমান্টিকতা মানায়
না
বুচ্ছেন?
'আচ্ছা মেরি রেখে দেই ভাল থাক।'

অনু কাব্য

নিঃশব্দ নুপুরের ঝংকার
ওঠে কার পায়ে..?
বাজুক নুপুর বাজুক শানাই 
তাতে কেন জ্বর আমার গায়ে....!

Wednesday, January 20, 2016

আমি

আমার সম্পর্কে জেনে কি করবেন ...?
আমি খ্যাত-বিখ্যাত কেউ নই।
হবো যে সেরকম সম্ভাবনা অবশ্য উড়িয়ে দেয়া যায় না। সেই তুলনায় আমার বাবা খুব খ্যাত না হলেও তাঁকে নিয়ে বলার মত বেশকিছু বলার আছে। তাই বলি কি আমার বাবা সম্পর্কে জানেন।
কেননা বাবার মাধ্যমেই না আমি!
সেই বাবাকে রেখে নিজের সম্পর্কে নতিদীর্ঘ বক্তৃতা দেয়া রীতিমত
বেয়াদবি বৈ কি! আসল কথা
আমি খুব বাবাভক্ত ছেলে কিনা।
আর হ্যাঁ, একান্তই যদি কেউ আমার সম্পর্কে জানতে চান - তবে তাকে একবার ডু'মেরে আসতে হবে আমার ছেলে 'সালমান রাজ'-এর এবাউটে । আশা করছি সেও আমার মত বাবাভক্ত ছেলে হবে। এবং এবাউটে তার পরিচয় দেবে। অবশ্য এখনি সেটা সম্ভব না। তার জন্য আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে।
আমি এখনো বিয়ে করি নাই কিনা তাই।
আর যদি স্রষ্টা 'সালমান রাজ' নামের করে কাউকে আমার ওয়ারিস করে না পাঠান বা পাঠালেও পোলা যদি আমার মত ঈমানদার না হয়ে অকৃতজ্ঞ বেঈমান নিকলে, তাহলে আর আপনি আমার সম্পর্কে জানতে পারলেন না।
তার জন্য আমি আগাম ক্ষমাপ্রার্থী।
আপনাকে অপেক্ষা করিয়ে রাখার জন্য লজ্জিতও বটে......!
তো এবার আমার বাবা সম্পর্কে কিছু বলি...............

'আমার আব্বা একজন সৎ পুলিশ অফিসার ছিলেন কিনা আমি নিশ্চিত না।
তবে খুব বেশি যে অসৎ ছিলেন না সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত। এবং তিনি যে ভাল মানুষির জন্য সৎ ছিলেন - ব্যাপারটা তা না।ঘুষ খেতেন না চাকরি যাওয়ার ভয়ে।
বিশেষ করে বড় অঙ্কের ঘুষ।
তিনি অত্যন্ত ভীতু প্রকৃতির একজন মানুষ। সদাসর্বদা পরিবারের ভরণপোষণ নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। "মোটা ভাত মোটা কাপড়" টাইপের স্লোগানে বিশ্বাসী। তার সারা জীবনের একটাই চেষ্টা ছিলো পরিবারের পাঁচটি মৌলিক অধিকার পুরণ করা। আমার বাবার পরিবারের ভরণপোষণ ভীতি কতটা প্রকট ছিলো একটা উদাহারণ দিলে বোঝা যাবে - একাত্তর এর স্বাধীনতা যুদ্ধে শুধু পরিবারের চিন্তায় মনেপ্রাণে একজন মুক্তি সৈনিক হওয়া সত্ত্বেও চাকরি রক্ষার খাতিরে যুদ্ধ করেছেন পাকিস্তান সরকারের পক্ষে।

আব্বার মুখে শোনা যুদ্ধকালীন সময়ের একটা ঘটনা বলতে ইচ্ছে করছে, 'একবার আব্বা ও তার টিম একটা ব্যাংকারে অবস্থান করছিল। রাতদুপুরে হঠাৎ ক্যাম্পে মুক্তিবাহিনী আক্রমন করে বসে। আব্বার সঙ্গিরা জবাবি হামলার অনুমতি চাইলে আব্বা বারণ করে। এবং হ্যান্ড মাইক দিয়ে নিজেই বারবার ঘোষণা করতে থাকে
"হে মুক্তি ভাইয়েরা, আমরা তোমাদের ভাই। এই ক্যাম্পে কোন পাকসেনা নাই। আমরা স্বাধীন বাংলার পক্ষে। পেটের দায়ে চাকরি করি।আমরা তোমাদের ভাই। তারপরও মুক্তি সেনারা চার হাজার রাউন্ড গুলি ছোড়ে। সেই রাতে তার মনে হয়েছিল আপন জাতিভাইদের হাতেই মরণ লেখা। দোয়া দুরুদ পড়ে চুপ করে ব্যাংকারে পড়ে ছিল।'
গল্পটা এই পর্যন্ত শোনার পর আমি আব্বাকে প্রশ্ন করেছিলাম, আব্বা- ঐ রাতে যদি আপনি সত্যি মারা যেতেন তাহলে আপনার মরণ হত স্বাধীনতার বিপক্ষের শত্রুসৈন্য হিসেবে।
আপনার কি ঐ রাতে একবারও মনে হয়েছিল আপনি স্বাধীন বাংলার সত্রু..?
মরে গেলে জাতী আপনাকে স্মরণ করতো না। করলেও ঘৃণাভরে করতো।
আব্বা চুপ ছিলেন। হয়ত ভাবছিলেন, 'যাদের জন্য করলাম চুরি তারাই বলে চোর। বলার আর কী'ই বা বাকি আছে..!'

যাহোক, কথা হল আমার আব্বা একজন সৎ অথবা অসৎ পুলিশ অফিসার ছিলেন।
না, কথা এটা না। কথা হল আব্বা আমাদের গ্রামে দাদার কাছেই রাখতেন। নিজে চাকরি করে বেড়াতেন জেলা থেকে জেলায়। এটার দু'টো কারণ ছিল। দাদার খেদমত প্লাস টাকা বাঁচানো।
এমনকি ভাইয়াদের আব্বার কাছে বেড়াতে যাওয়াও পছন্দ করতেন না। এটার কারণ আমরা জানতাম না। একবার বড় ভাইয়া হুট করে আব্বাকে কিছু না জানিয়ে গিয়ে উপস্থিত হন তার কর্মস্থলে। সম্ভবত
আব্বা তখন বরিশালের কোন এক থানায় কর্মরত। ভাইয়ার এমন অকস্মাৎ উপস্থিতে আব্বা যেন খুব সঙ্কিত। কারণটা ভাইয়া বুঝতে পারে রাত বারটার পরে। ভাইয়া দেখে রাত বাড়তেই থানার চেহারা পাল্টে গেছে। অফিসারর্স থেকে শুরু করে কনেস্টবল সবাই বসে গেছে জুয়া খেলতে। কেউবা বাংলা মদ নিয়ে আআসর জমিয়েছে। ভাইয়ার তো চোখ ছানাবড়া। এক কনেস্টবল ভাইয়ার হাত ধরে জোর করে মজলিশে বসিয়ে দিয়ে বলে-ছোট ভাই চলবে নাকি...?
কিয়ের চলবে...! অজপাড়াগায়ে বড় হওয়া আমার ভাই মদই দেখলো এই প্রথম তাও আবার পুলিশ ক্যাম্পে।

কথা কিন্তু এটাও না। আমার আব্বা যখন রিটায়ার করবে তখন উপরের অফিসাররা আব্বাকে খুব করে বলেছিল - 'সাইদ তোমার দু'দুটো উপযুক্ত ছেলে আছে। তুমি বের হওয়ার আগে অন্তত একজনকে পুলিশে দিয়ে যাও।
সামনে পুলিশের চাকরি দেখবে সোনার হরিণের দামে বিক্রি হবে।এই খবর যেকোনভাবে ভাইয়ারা জানতে পারে। এবং আব্বাকে দুই ভাই'ই খুব করে ধরে - আব্বা, আমাকে পুলিশে দাও আমাকে দাও। কিন্তু আব্বা নাছোড় বদ্ধপরিকর কোনমতেই ছেলেদের পুলিশে দেবে না।
মা কারণ জানতে চায় ভাইয়ারা কারণ জানতে চায়। আমার আব্বার এক কথা পুলিশে কষ্ট খুব বেশি। আমার উপায় ছিল না তাই করেছি।
আমার ছেলেদের আমি এত কষ্ট করতে দেবো না। আসলে কি কারণ এটা ছিল...? আজ আর আমার তা মনে হয় না। আমার বোকাসোকা ভীতু বাবাটা তখনই বুঝতে পেরেছিল পুলিশ ডিপার্টমেন্টের নৈতিকতার অবক্ষয়টা তলানিতে ঠেকতে সামান্যই বাকি।
বর্তমান পুলিশ ডিপার্টমেন্টের অবস্থাটা আমার আব্বা তখনই অনুমান করতে পেরেছিলেন। এবং প্রচণ্ড ভয় পেয়েছিলেন ছেলেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে। তাই যেকোন মূল্যে ভাইয়াদের পুলিশে যাওয়া ঠেকিয়েছিলেন।
আজ খুব গর্ব করে আমার বাবার ভীরুপনাকে স্যালুট করতে ইচ্ছে করে।
'আই স্যালুট ইউ বাবা'
কেননা তার ভীরুপনা পরিবার নিয়ে অতিমাত্রার দুশ্চিন্তা বাহাত্তরের মত ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ থেকেও আমাদের মত মধ্যবিত্তের নিচে বাস করা পরিবারকে রক্ষা করেছিল।
একবেলা কাউকে না খেয়ে থাকতে হয়নি।
যখন জমিদারের বাড়িতেও তিনবেলার জায়গা একবেলা রান্না হত।

পুনশ্চঃ আমার আব্বা কিন্তু পরবর্তিতে
বাংলাদেশ পুলিশ ডিপার্টমেন্ট-এর অধীনে 29 বছর সার্ভিস দিয়ে 2000 সালে অবসর নিয়েছেন।

পুনশ্চঃ২ বর্তমানে আমার বাবা পুলিশকে ভীষণ ভয় পায়। কিছুদিন আগে পরিবার সুদ্ধা একটা মারামারির কেসে পড়ছিলাম। আব্বা মাগরিবের নামায পড়ছিলেন। এমন সময় আমার এক প্রতিবেশী কাকা ঘরের পিছন থেকে হাক ছেড়ে বলে...... "ও সইয়াদ ভাই, পুলিশ আইছে পলাও" কিয়ের নামায, আব্বা'রে দেখলাম মূহুর্তে উঠান পেরিয়ে পুকুর পাড় ছাড়িয়ে পাটখেতের মধ্যে উধাও হয়ে গেল। উঠানে ছিল প্লাস্টিকের বদনা। ওটা আব্বার পায়ে লেগে পুরা পেনাল্টি কিক হয়ে কই যে গেলো আল্লা মালুম।
আমিও আসামী কিন্তু আব্বার দৌড় দেখে পুরাই থ। পালানোর কথা ভুলেই গেলাম।
বেটা ৭৫ বছর বয়সেও এত জোরে দৌড়াতে পারে। বাপরে.....!

পুনশ্চঃ৩ বাবার বয়স এখন ৮০ ছুঁই ছুঁই।
তবু বাবা যথেষ্ট সুস্থ ও কর্মঠ আছেন।
তবু সবাই দোয়া করবেন।"

এই পর্যন্ত পড়েছেন ...?
আপনাকে ধন্যবাদ।
এবার আপনাকে আমি একটা প্রশ্ন করবো। আপনি যদি আমার মত সরল পাঠক হয়ে থাকেন তবে আপনার জন্য প্রশ্ন- "আমার বাবা কি রাজাকার ছিলেন নাকি একজন মুক্তিযোদ্ধা ....?"

পাঠক, আপনি যদি বোদ্ধা হয়ে থাকেন তবে আপনার জন্য প্রশ্ন- "গল্পে বাবার প্রশংসা করা হল নাকি নিন্দা....?"

আর যদি পাঠক আপনি হয়ে থাকেন বিশ্লেষক পর্যায়ের, তবে আপনার জন্য রাখছি এই প্রশ্নটি-
"আপনার দৃষ্টিতে আমি কোন ক্যাটাগরির লেখক....?"
পাঠক আপনাকে কষ্ট করে উত্তর দিতে হবে না।
তবু দিতে চাইলে ইনবক্সে দিতে পারেন।
বাবাকে নিয়ে এই সুদীর্ঘ স্তুতি গাওয়ার পর নিজের সম্পর্কে না বললাম-দু'চার লাইনের একটা ভূমিকা অন্তত নেয়া যেতে পারে কি বলেন ...?

'আমি হচ্ছি একটা বইয়ের মত। কাভার প্রচ্ছদ'টা একদম সাদামাটা রম্য বইয়ের
আঙ্গিকে করা। বইয়ের নামটাও বেশ সুন্দর - "পুটকা হুযূর"
এই নামে আমার দু'টি প্রিয় মানুষ মাঝেমধ্যে আমায় ডাকতো।
মা বলতেন - "বাবা, পুটকা হুযূর হবা না। আমলি হুযূর হবা। "
আর মামাত বোন সাহেরা বলতো-"আপনি হচ্ছেন একটা পুটকা হুযূর।"
দু'জনের বলাটাই বড় মধুর লাগতো।
অবশ্য এখন আর কেউ বলে না।

টিকাঃ
'ফটকা'-এর আঞ্চলিক সংস্করণ হচ্ছে 'পুটকা'। গ্রামের মানুষেরা শব্দের আকার-আকৃতি পরিবর্তন পরিবর্ধনের ক্ষেত্রে সাধারণত কোন নিয়ম-কানুন মানে না। যেমন নোয়াখালীরা পাঁচ টাকা'রে বলে 'হাঁস টিঁয়া'...!

যাহোক পুটকা হুযূরকে
প্রথম দর্শনেই আপনার ভাল লাগবে। লেড়েচেড়ে মজা পাবেন। আপনি গম্ভীর প্রকৃতির হলেও হয়ত একটু হাসবেন।
তবে বইয়ের ভেতরের রচনাগুলো খুব দুর্বোধ্য ভাষায় লেখা। অনেকটা আধুনিক কবিতার মত ছন্দ-অন্ত ছাড়া তালহীন। বহু অধ্যায় তো স্বয়ং নিজেরই বোধের বাইরে। তবু কেউ গভীরভাবে বুঝতে চাইলে অনুভবে ধরা দেবে রচনার রেণু। খুঁজে পাবেন অন্তমিল।
পছন্দ অপছন্দের একটা ছোট্ট তালিকা দেই..................
ভীষণ ভালবাসি = সরল সৌন্দর্য
ভীষণ ঘৃণা করি = কৃপনতা
কৃপনের মাইরে বাপ।
তবে কৃপনের কাছে আমিও শক্ত কৃপন।
বেয়াদবের সঙ্গে দারুন দাপটে বেয়াদবি করি হোক সে বড়।
কেউ গভীরভাবে বুঝতে চাইলে নিজেকে খুব কঠিন করে তুলি। বিশেষ করে চালাক চতুর কেউ আমাকে পর্যবেক্ষণ করে । ভালবাসার মায়ায় খুব সহজে আটকাই এবং ছটফট করি।

প্রিয় পাঠক এই পর্যন্ত আমার সম্পর্কে যা পড়লেন দয়া করে সব ভুলে যান । এর ওপর বিশ্বাস করার কোন মানেই হয় না । কেননা আমার সম্পর্কে সর্বশেষ তথ্য হলো 'আমার মিথ্যা বলার অভ্যাস আছে।' আর আমি নিজেকে খোলা বইয়ের মত ভাবতে অপছন্দ করি।

তাই আমার সম্পর্কে একবাক্যে বলতে গেলে বলিউড হিরোদের একটা ডায়ালগ চুরি করে সবচেয়ে ভাল বলা যেতে পারে।তা হলো........
" ম্যাঁই দিল মে আতা হু, দেমাগ মে নেহি"'

=শোকের চোখ=



স্বপনের আজ অফিসে যেতে ইচ্ছে করছে না। গুম মেরে শুয়ে আছে নিজের ছোট ফ্লাটে।
সকাল নয়টায় শুধু একবার ঘুম ভেঙ্গেছে।
আর মনে মনে অফিসে নাযাওয়ার ইচ্ছাটা পাকা করে আবার ঘুমিয়ে পড়েছে।
রিংটোনের বিকট চিৎকারে ধড়ফড় করে উঠে বসে।
'স্লামালাইকুম মামা!'
'ওয়ালাইকুম, তোর খালু এই মাত্র ইন্তেকাল করেছে। তাড়াতাড়ি বারডেম চলে আয়।
লাশের সঙ্গে তোকে যশোর যেতে হবে।'
লাইন কেটে যায়। স্বপন চুপচাপ কতক্ষণ বসে থাকে। ভাবে, একেই বলে নিয়তি! অফিসে যেতে কষ্ট লাগছিলো, এখন যশোর যেতে হবে! লাফদিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। বিছানার প্রতি লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকায়, আবার কখন গা এলিয়ে এখানে শুতে পারবে কে জানে....!
পদ্মাঘাটে ওরা খাওয়া দাওয়া করে নেয় ফেরির হোটেলে।
স্বপন পেটপুরেই খায়। তবে চেহারার মাঝে একটা দুখিদুখি ভাব রেখে দ্রুত খেয়ে নেয়।
খালাত ভাইকে ভাত খেতে সাধাসাধি করতে ওর খিদে আরো বেড়ে যায়।
ন্যাকামি দেখলে গা জ্বলে যায়।
ভাবটা এমন যেন বাপ মারা গেছে আর কোনদিন ভাত খাবে না।
শোকে পাথর হয়ে থাকবে। শিক্ষিত মানুষের এই জাতীয় কুসংস্কার দেখলে স্বপনের পিত্তি গরম হয়ে যায়।
তবু সব রাগ সংবরণ করে দাদাভাই সোনাভাই সবাইকেই একদিন যেতে হবে।
আমরা থাকার জন্য নই।
কেউ চাইলেও থাকতে পারবে না ইত্যাদি মহাবাণী সমূহ শুনিয়ে তবেই ভাত খাওয়াতে রাজি করাতে হয়।
ব্যাপারটা খুব জটিল। বিশেষ, নিজের ভেতর যখন ফিলিং থাকেনা।
স্বপন এই লাশবাহী যাত্রাকে মনে মনে একটা ভ্রোমণ পার্টি হিসেবে ভেবে নিয়েছে।
লাশটাকেও একজন ভ্রোমণ সঙ্গী হিসেবে নেয়। ভ্রোমণস্পটে গিয়ে একদল ক্যামিস্ট্রিদের সহায়তায় তাকে হীমঘর থেকে জাগিয়ে তোলা হবে। সেও আমাদের সঙ্গে পিকনিকে শামিল হবে।
কবে যেন এমন একটা গল্প পড়েছিলো স্বপন। 'এক বড় নেতা দেশের চরম গণ্ডগোলের সময় জানের নিরাপত্তার স্বার্থে দেশ থেকে বেরিয়ে যাবে। কিন্তু জীবিতাবস্থায় শত্রুচোখ ফাকি দিয়ে বের হওয়া অসম্ভব।
তখন একদল শুভাকাঙ্ক্ষী বিজ্ঞানী নেতাকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় ছোট একটা আইসক্রিমের বাক্সে ঢুকিয়ে ফরফে পরিনত করে দেয়। এবং আইসক্রিম এর গাড়ী করে বর্ডার পাস করে।
স্বপন একবার ভাবে, লাশটাও জিন্দা হবে।
তবে ক্যামিস্ট্রিদের সহযোগীতায় নয়। হবে
ফেরেশতাদের সহয়তায়।
রাত আটটা নাগাত স্বপনরা যশোর খালুবাড়ী পৌঁছে যায়।
কাঁন্নার ঢল নামে। অবশ্য স্বপন মানুষিকভাবে প্রস্তুত ছিলো।
লাশ কবরস্ত করতে করতে রাত বারটা বেজে যায়।
এবার স্বপন লক্ষ্য করে বাড়ীময় নেমে এসেছে এক মরণ নীরবতা।
গা ছমছম করা নীরবতা।
স্বপনের একবার মনে হয় এই নীরবতার চেয়ে কাঁন্নাই ভাল ছিলো।
স্বপন ছিলো উঠানে চেয়ারে বসা।
খালাত ভাই আফজাল পিছন দিয়ে এসে হাত ধরে হাটা শুরু করে।
মুখে কোন কথা নাই।
এবাড়ীর কারোরই যেন আর কথা বলার কিছু নাই। কাঁন্নার কিছু নাই।
ঝড়ের শেষের অখণ্ড নীরবতা চলছে।
কেউ যেন তা আগে ভাঙ্গতে চায় না।
ওরা পাশের বাড়ীর উঠানে এসে দাড়ালো।
আফজাল হাত ছেড়ে দিয়ে বারান্দায় গিয়ে ডাক দিলো 'রিতু......'
পরমুহূর্তেই স্বপন দেখলো এক কিশোরী মেয়ে, 'জি ভাইজান'
'বারান্দার চকিটায় ভাল মত বিছানা কর।
আর একজগ পানি গ্লাস রাখিস মাথার কাছে।' স্বপন দেখলো মেয়েটা দ্রুত কয়েকবার মাথা লাড়ালো।
স্বপনকে উদ্দেশ্য করে আফজাল যেতে যেতে বললো, ' লাপনি এখানেই ঘুমান। কোনকিছুর প্রয়োজন হলে আওয়াজ দিবেন ওরা ব্যবস্থা করবে।'
'আচ্ছ!'
মেয়েটা ডাক দেয় 'আসুন।'
নিঃশব্দে স্বপন উঠে আসে বারান্দায়।
টয়লেট যেতে হলে , বলেই মেয়েটা হাত দিয়ে ইশারা করে। স্বপন দেখে নেয় টয়লেটের অবস্থান।
মুখে বলে,'ধন্যবাদ!'
পরের দিন সকাল দশটা। স্বপন ঢাকায় ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অদূরে একটা আমগাছের নিচে রিতু দাঁড়িয়ে আছে।
চোখের ভাষা কী যেন বলতে চায়।
কয়েকবার বেশ কয়েকবার চোখাচোখি হল। স্বপনের চোখেও কি যেন ভেসে ওঠে আবার নিভে যায়। স্বপন ভাবে গ্রামের নাইন টেন পড়ুয়া একটা মেয়ে হয়েও যথেষ্ট স্মার্ট।
বিশুদ্ধ উচ্চারণ। গায়ের রঙ বাদামি ফরসা।
ঘন কালো চুল।
রূপসী না হলেও চোখ কান নাক মোটকথা সমস্তটা মিলে এক মায়াময় রূপের আকর্ষণ কেমনে স্বপন উপেক্ষা করে।
চোখের মনিগুলো কী অপার্থিব সুগভীর রহস্যধারিণী মধুবর্ণ ।
এখনই স্বপনকে ফিরতে হবে। কী করবে স্বপন কিছুই বুঝে উঠতে পারেনা।
শোকের পরিবেশে এ তার কী হল।
অপরাধবোধে কুঁকড়ে যায় স্বপন।
না, এখনো তাকিয়ে আছে রিতু।
এ চোখ উপেক্ষার নয়। কিছু একটা করা দরকার। উঠোন ভরা মানুষ।
হঠাৎ করে একটা বুদ্ধি মাথায় আসে।
মানিব্যাগ থেকে একটা কার্ড বের করে একটু সামনে হেটে যায়। উঠানের পাশে একটা মালঞ্চগাছের মাচা, সেখানে একফাকে কার্ডটা ডুকিয়ে রেখেই স্বপন তাকায় মেয়েটার দিকে।
ওমা, স্বপন লক্ষ্য করে রিতুর চোখের সেই আকুতির যায়গা ঘিরে রাগ ফুটে উঠেছে।
স্বপন ভেবে পায়না হঠাৎ রেগে গেল কেন মেয়েটা......
কি মনে করে স্বপন পিছন ফিরে তাকায়। এবং দেখতে পায় আফজাল তাকিয়ে আছে ওর দিকে। চোখাচোখি হতেই আফজাল চোখ সরিয়ে নেয়।
স্বপন ধীর পায়ে পিছে ফেরে।
কার্ডটা ইতোমধ্যে হাতের মাঝে দলা পাকিয়ে নিয়েছে। মামা তাড়া দেয় গাড়ীতে ওঠ, তাড়াতাড়ি তাড়াতাড়ি....!
স্বপনের আর সহস হয়না তাকাতে।
তবু একবার তাকায়।
না নেই। আমগাছের নিচে আর কেউ নেই।
গাড়ী স্টার্ট নেয়। স্বপনের ইচ্ছে করে বলতে, ড্রাইভার দাঁড়াও, দু'মিনিট।
আমি আসছি। বলা হয়না।
মামা বলে স্বপন, গ্লাস লাগিয়ে দে,
এসি চলছে।
রাত এগারটা। স্বপন শুয়ে আছে তার ছোট ফ্লাটে। ঘুম আসছে না।
মাথার মধ্যে একটা পোকা ঢুকেছে।
কিছুতেই বের হচ্ছেনা।
ধুর...! তাড়াতাড়ি ঘুমানো দরকার।
কাল অফিসে যেতেই হবে......!